বিশেষ খবর

ক্যাম্পাস’র সাথে সাক্ষাৎকারে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক প্রফেসর ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
img

ছাত্রজীবনে মেধাবী ছাত্র, কর্মজীবনে মেধাবী শিক্ষক, মেধার স্ফূরণ তাঁর জীবনকে দিয়েছে বর্ণিল আভা, কর্মযোগকে করেছে সুষমা-মন্ডিত। শিক্ষকতায় ব্যাপৃত থেকে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে কোয়ালিটি শিক্ষা প্রসারে বরাবর নিবেদিত থেকেছেন। শিক্ষাকে গ্রহণ করেছেন সমাজ-প্রগতির বাহন হিসেবে। প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ যাঁর কথা বলছিলাম, তিনি হলেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব একাউন্টিং ইনফরমেশন সিস্টেম এর জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক প্রফেসর ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক। যার যাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় দেশে বাণিজ্য শিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ঢাকা কমার্স কলেজ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি) ইতোমধ্যেই দেশের মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চ এর চেয়ারম্যান এবং বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ ও কল্যাণকামী শিক্ষাদ্যোক্তা এ ব্যক্তিত্বের সাথে ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যাম্পাস পত্রিকার কন্ট্রিবিউটর মোহাম্মদ মোস্তফার অনুলিখনে নিচে সন্নিবেশিত হলো।
শৈশবের দুরন্তপনার দিনগুলো কেমন কেটেছে, সে সময়ের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কি এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, বাবা সরকারি চাকুরে থাকার কারণে প্রায়ই বিভিন্ন জেলায় বদলি হতেন। ফলে স্কুলের গন্ডি পেরুতে আমাকে ৪/৫ টি স্কুলে লেখাপড়া করতে হয়। আমার দাদার বাড়ি ঢাকার গুলশানে হলেও আমার জন্ম মাগুরায়। তখন বাবা মাগুরার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। পরে বাবা মাগুরা থেকে বদলি হয়ে যখন নাটোরে যান, তখন আমার বয়স ৪ বছর। নাটোরে যাবার কিছুদিন পরেই বাবা আমাদের নাটোরের রাজ বাড়ি দেখাতে নিয়ে যান। বিরাট দিঘি, পাশে বিরাট মাঠ। রাজবাড়ির গেটে লোহার এক সিপাই দাঁড়ানো ছিল; আমার এখনও মনে পড়ে, আমি অবাক বিস্ময়ে সেদিন লোহার সিপাহিটাকে দেখেছিলাম।
তিনি বলেন নাটোরে ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন আব্বা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বসাতেন; আমাদের বাসার সামনে দিয়ে দুধ বিক্রেতারা যেত, আর আব্বা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের সাহায্য নিয়ে ল্যাক্টোমিটার দিয়ে দুধ পরীক্ষা করাতেন। ভেজাল দুধ পাওয়া গেলেই তা আমাদের বাসার পাশের নারিকেল গাছের গোড়ায় ঢালা হতো। আব্বা বলে বলছি না, তখনকার ম্যাজিস্ট্রেটরা ছিলেন অত্যন্ত সিনসিয়ার। ৭/৮ বছর আগে নাটোরে যখন গিয়েছিলাম, তখন দেখে এসেছি আমাদের সেই বাসায় বাংলাদেশ মহিলা সংস্থার স্থানীয় অফিস চলছে। বাসার অন্য পাশে খেলার মাঠ ছিল, যেখানে আমি আর আমার বড় ভাই অন্য খেলার সাথীদের নিয়ে খেলাধুলা করতাম। আব্বার অফিসের পিয়ন এ সময় আমাদের দেখাশুনা করতেন। মাঝে মধ্যে সুযোগ হলে আব্বাও আমাদেরকে মাঠে নিয়ে যেতেন।
তিনি আরও বলেন আব্বা নাটোর থেকে ট্রান্সফার হয়ে ভোলা চলে আসেন, শুকনো জায়গা থেকে জলা জায়গায় আসলাম। বদলি হয়ে আসার পর জিনিসপত্র গোছাতে দু’তিন দিন সময় লেগে যেত। এ ক’দিন রাতে ফ্লোরে থাকতে হতো আমাদের, যা আমরা খুব উপভোগ করতাম। যেহেতু ভোলা পানির জায়গা, তাই আব্বা তাঁর পিয়নকে ডেকে বললেন আমাদের দু’ভাইকে সাঁতার শিখিয়ে দিতে। পিয়ন আমাদেরকে ভাই বলে সম্বোধন করত। বাসার পেছনের পুকুরে সাঁতার শেখার ব্যবস্থা হলো। তিন মাসের মধ্যেই আমরা সাঁতারে দক্ষতা অর্জন করলাম। ভোলাতেই শিক্ষাজীবন শুরু হলো আমার। তবে একটা গার্ল্স স্কুলে। কারণ ছেলেদের স্কুলটি ৪র্থ শ্রেণি থেকে হওয়ায় ক্লাস ওয়ানে ঐ গার্লস স্কুলে ভর্তি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ১৯৫৬ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে সী-প্লেনে করে ভোলা এলেন। তখন আব্বা ভোলার প্রশাসক হিসেবে তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানালেন। ভোলায় তখন পাকা রাস্তা ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে দ্রুত ইট বিছিয়ে কিছু রাস্তা তৈরি করা হলো। বঙ্গবন্ধু সেদিন যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তার কিছু অংশ আমার বড় ভাই প্রায়ই বলতেন। আর তা হলো বাঘে যেমন ছাগল ধরে, আমরাও তেমনি ঘুষখোর দুর্নীতিবাজদের ধরব।
আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ছি, তখন আব্বা ট্রান্সফার হলেন টাঙ্গাইলে। টাঙ্গাইল আমার খুব পছন্দ হলো। এখানকার অনেক স্মৃতি আমার মনে আছে। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হলাম। আমাদের বাসা ছিল আকুর-টাকুর এ। আমাদের স্কুলের সামনে ছিল বিরাট মাঠ; আমি স্কাউটিংয়ের ছোট গ্রুপ ‘কাব’ এ যোগ দিলাম। মনে পড়ে, প্রশিক্ষক শহীদ স্যার আমাদের খুব যতœ করে ট্রেনিং দিতেন। পরবর্তীতে তিনি ন্যাশনাল স্কাউটস এর বড় দায়িত্ব পেয়েছিলেন। টাঙ্গাইল থাকতে ক্রিকেট খেলাও শিখলাম। সেসময় আমার বড়ভাই লাহোর জাম্বুরিতে যোগদানের সুযোগ পেলো। জেনারেল আজম খান তখন পূর্ব-পাকিস্তানের জনপ্রিয় গভর্নর। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু, পাঞ্জাব প্রভৃতি প্রদেশের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের স্কাউটরা যোগ দেয় লাহোর জাম্বুরিতে; সেখানে গভর্নর আজম খানও ছিলেন। আজম খান পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের স্কাউটদের দেখার পর বার বার বলতে থাকলেন ডযবৎব রং সু নড়ুং অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের ছেলেরা কোথায়? তারা যখন প্যারেড করে সামনে দিয়ে পাস করল, তখন তিনি শান্ত হলেন। বড় ভাইয়ের মুখে ঘটনাটা শুনে শিশু-বয়সেও আনন্দ পেয়েছিলাম।
ড. সিদ্দিক বলেন, বড় ভাই রফিক সিদ্দিক শিয়ালকোর্ট থেকে ২টি ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে আসলেন। খেলাধুলার উন্নতমানের সাজসরঞ্জামের জন্য শিয়ালকোটের খ্যাতি তখনও ছিল শীর্ষে। ক্রিকেট ব্যাট হাতে আসার পর আমাদের পজিশন সহপাঠীদের কাছে বেড়ে গেল। আমরা স্কুল মাঠে, কোর্টের সামনে, এসডিও অফিসের সামনে যখন-যেখানে সুযোগ পেতাম সেখানেই ক্রিকেট খেলতাম মহানন্দে। বড়ভাই ক্রিকেট পাগল থাকায় যখন-তখন তাঁর সাথে ক্রিকেট খেলতে পারলেও ঘুড়ি ওড়াতে বা ঘুড়িতে মাঞ্জা দিতে পারতাম না। কারণ ঘুড়ি ওড়ানো বড় ভাইয়ের পছন্দ ছিল না। আমার ছোটভাই তারেক আহমেদ সিদ্দিক স্বপন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। সে ছিল আমার ছায়াসঙ্গী, বড় ভাইয়ের দৃষ্টির আড়ালে তাকে নিয়ে ঘুড়ি ওড়াতাম; বনে বনে গুল্তি দিয়ে পাখি শিকার করতাম। কিন্তু বড় ভাইয়ের কড়া শাসনের কারণে আমাদের দুরন্তপনা নিয়ন্ত্রণে থাকত। তারপরও টাঙ্গাইলের জীবনটা ছিল সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আনন্দের।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ জারি হয়। তখন স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যু বার্ষিকী, আইয়ুব খানের বিপ্লব দিবস এগুলো জমকালোভাবে পালন করা হতো, গভর্নমেন্ট অফিসারের সন্তান হিসেবে আমরা সেসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতাম। বড়ভাই আমাকে টাঙ্গাইলে থাকতে ডিবেটে অংশগ্রহণের পরামর্শ দিল। আমি আস্তে আস্তে টাঙ্গাইলে ডিবেটর বা বিতার্কিক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলাম। আমি যখন ক্লাস সিক্সে, তখন আব্বা নারায়ণগঞ্জে বদলি হলেন। টাঙ্গাইলে থাকতে আবৃত্তি, ডিবেটসহ সহিত্য চর্চায় যুক্ত থেকেছি; কিন্তু বাণিজ্যিক এলাকা নারায়ণগঞ্জে টাকা-পয়সার কথাই বেশি আলোচনা হতে দেখলাম। তবে নারায়ণগঞ্জ স্কুলে নিয়মিত সাহিত্য প্রতিযোগিতা হতো। স্কুলের সামনে ছিল বড় মাঠ -যা ক্রিকেট, ফুটবল সব খেলার উপযোগী। নারায়ণগঞ্জে সেভেন ও এইট ক্লাস পর্যন্ত পড়লাম। এরই মধ্যে আব্বা আবার বদলি হয়ে গেলেন চট্টগ্রামে। আমরা চট্টগ্রাম শহরের নতুন বাসায় উঠলাম। আমি চট্টগ্রামে মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি হলাম ক্লাস নাইনে। টাঙ্গাইল এবং নারায়ণগঞ্জে আমি ক্লাসে ফাস্ট-সেকেন্ডের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু চট্টগ্রামে ধাক্কা খেলাম, আমার পজিশন ১০ নম্বরে নেমে এলো। কিন্তু পরীক্ষায় ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ডিবেট এবং আবৃত্তিতে কেউ আমাকে ডিঙ্গিয়ে যেতে পারল না।
১৯৬৬ সালে আমার মেট্রিক পাসের আগেই আব্বা পটুয়াখালীতে বদলি হলেন এসডিও হিসেবে। কোথায় চট্টগ্রাম আর কোথায় পটুয়াখালী! বদলির ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো ওজর-আপত্তি, পছন্দ-অপছন্দ কোনো কিছুই ছিল না। সরকার যেখানে প্রয়োজন মনে করত, সেখানেই বদলি করত। আমরা খুশিমনে পটুয়াখালীতে চলে গেলাম। আমি পটুয়াখালী কলেজে কমার্সে ভর্তি হয়ে যশোর বোর্ডের অধীন মেধা তালিকায় ৪র্থ হলাম। তবে এ কথা সত্য, আব্বার অনুপ্রেরণা আর কলেজ শিক্ষকদের সহযোগিতা না পেলে হয়ত আমি এত ভালো রেজাল্ট করতে পারতাম না।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের ছাত্রসংগঠন এনএসএফ এর দাপট। এরই মধ্যে আব্বা ঢাকায় বদলি হয়ে আসলেন। তখন আমরা দু’ভাই ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আর বোন ভর্তি হলো ইডেনে। আমরা আজিমপুর কোয়াটারে থাকতাম। এ সময় মাথায় নতুন আইডিয়া আসল, এক বছরের স্কলারশিপের টাকা জমিয়ে মটরসাইকেল কিনে ফেললাম। মটরসাইকেল কেনার পর আমার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা বেড়ে গেল। বিকেল হলেই মটরসাইকেল নিয়ে মহসীন হল, সূর্যসেন হল, এসএম হলে আড্ডা দিতে আসতাম। পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, এক্সটেম্পোর স্পীচ, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নিয়মিত হয়ে গেল। এরই মধ্যে সারা বাংলাদেশে আমি উপস্থিত বক্তৃতা এবং ডিবেটে দ্বিতীয় হলাম। স্কুল জীবনের স্মৃতি ও বন্ধুদের কথা জানতে চাইলে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, চট্টগ্রামের বন্ধু ড. সারোয়ার এখন লন্ডনে আছে। ইসা মাহমুদ, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ। ১৯৭৬ সালে আমি যখন লন্ডনে যাই, তখন ইসা ও সারোয়ার আমার খোঁজ খবর রাখত। চট্টগ্রামের আরেক বন্ধু হোসেন খালেদ একটি বীমা কোম্পানির এমডি। আমার বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধব ইংল্যান্ড-আমেরিকায় ভালো পজিশনে আছে। আরেক বন্ধু জহির বুয়েট’র শিক্ষক ছিল, কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করেছে। তাছাড়া সহপাঠীদের মধ্যে ড. মান্নান, ড. হারুন, ড. আব্বাস, প্রফেসর খালেদা, প্রফেসর আবু সালেহ, খলিলসহ আরো অনেকে আছেন।
তিনি বলেন চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলে পড়াকালীন আমাদের কেমেস্ট্রি পড়াতেন সাত্তার সাহেব; তিনি আমাকে বলতেন তুমি অনর্গল কথা বলো, দেখো মরার আগে তোমার বাকশক্তি রহিত হয়ে যাবে। প্রকৃতির কী খেয়াল, আমার বেলায় তার আংশিক হলেও ঘটেছে; ১৯৯২ এ ব্রুনাইতে চাকরিরত অবস্থায় অসুস্থতাকালীন সময়ে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে আমাদের মুসলিম হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সিরাজুল ইসলাম স্যার। একদিন বাসায় ফিরে দেখি, স্যার আমার আব্বার সাথে কথা বলছেন। আমি একটু দেরি করেই বাসায় ফিরতাম। স্যার আমাকে দেখে বললেন তুমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী, দেরি করে বাসায় ফিরছো কেন! তখন শিক্ষকরা ভালো ছাত্রদের বাসায় আকস্মিক ভিজিট করে ছাত্রদের খোঁজ-খবর নিতেন। পড়ালেখায় কোনো অনিয়ম হচ্ছে কিনা, তা নিজেই নিশ্চিত হতেন। সেসময় প্রাইভেট কোচিং ছিল না। আমরা প্রয়োজনে স্কুলের পরে স্যারদের বাসায় গিয়ে অংক করতাম, ইংরেজি পড়তাম। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে ৩ মাস এ স্পেশাল কোচিং স্যাররা নিজ উদ্যোগেই করাতেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিনগুলোর কথা বলবেন কি এমন প্রশ্নের জবাবে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-ছুটি নিয়ে ১৯৭৬ সালে লন্ডন গেলাম এমএস করতে। সেখানে গিয়ে চাকরি করলাম অনেকটা কৌশলগত কারণে, ৩ বছর না থাকলে সেখানকার রেসিডেন্ট হওয়া যায় না। ৩ বছর অবস্থান করলে লোকাল স্টুডেন্ট হিসেবে অনেক সুবিধা পাওয়া যেত। সেসময় দু’বছর প্রাইভেট কলেজে শিক্ষকতা করেছি, আর লন্ডনে সিএ ফার্মে কাজ করেছি। ১৯৭৭ সালে শেখ রেহানাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করি। ১৯৭৮ সালে লন্ডনে আমার ডিগ্রি শেষ হলো। আমার স্ত্রীকে রসিকতা করে বললাম ব্রিটিশ ডিগ্রি নিয়ে ব্রাহ্মণ হলাম। কারণ লন্ডনে পড়তে যাবার পর আমি অতীতে যে ইন্টারমিডিয়েটে স্ট্যান্ড করেছি, অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি তার কোনো দামই ছিল না। এমএস করার পর বিভিন্ন জায়গায় এপ্লাই করলাম, যেখানে এপ্লাই করি, সেখানেই চাকরি হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের বাণিজ্য বা অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডক্টরেট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ১৯৮৩ তে এক বছরের জন্য বাংলাদেশে আসলাম ডাটা কালেকশন করতে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, দীর্ঘদিন পরও ফিরে না আসাতে আমার চাকরিটা চলে গেছে।
বিদেশে পড়াকালীন কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কী এমন প্রশ্নে ড. শফিক সিদ্দিক বলেন, ইংল্যান্ডে পড়াকালীন আমার সুপারভাইজার আমাদের দু’জনের জন্যে দু’টো বিয়ার অর্ডর দিলেন। আমি আস্তে করে বললাম, আমাদের দেশে বিয়ার খাবার প্রচলন নেই। আমি বরং অরেঞ্জ জুস খাই। আমার কথা শুনে তিনি হেসে বললেন, গতবছর এই কোর্সে আমার একজন শ্রীলংকার ছাত্র ছিল; তারও তোমার মতো বিয়ার খাওয়ার অভ্যাস ছিল না। কিন্তু শেষের দিকে সে ইংলিশ বিয়ারের ভক্ত হয়ে পড়ে। এই কথা শুনে মনে হলো, সেই শ্রীলংকার ছাত্রের ইংলিশ বিয়ারের প্রতি আসক্তি আসাতে আমার সুপারভাইজার খুব খুশি হয়েছিলেন। আমার এই শিক্ষকের আনন্দ দেখে আমার একটি দেশি প্রবাদবাক্য মনে পড়ল ‘এক দেশের আচার, অন্য দেশের অনাচার’। এখানেই শেষ নয়, তিনি আরও বললেন, ইন্ডিয়াতে নাকি মদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে বলে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মোরারজী দেশাই এর এই ঘোষণা শুনে তিনি যেন চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। দুঃখ করে মন্তব্য করলেন ওহফরধ রং মড়রহম ঃড় নব ধ ফৎু পড়ঁহঃৎু. তার দুঃখ ভারাক্রান্ত মন্তব্য শুনে আমার মনে হলো মদ নিষিদ্ধ হয়ে গেলে ইন্ডিয়ার কোটি কোটি মানুষ যেন পিপাসায় মারা যাবে! বিদেশে এ ঘটনাটা আমার স্মৃতি হয়ে থাকবে।
শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা যোগ দিতে তেমন আগ্রহী নয় কেন, তাদেরকে কীভাবে আগ্রহী করে তোলা যায় এমন প্রশ্নে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক প্রফেসর শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, আমাদের সময়ের শিক্ষকরা যা বেতন পেতেন -তা দিয়ে স্বচ্ছন্দে চলতে পারতেন; তাদের মধ্যে একটা সন্তুষ্টি কাজ করত। এখন যুগ পাল্টেছে, সমাজে চাহিদা বেড়েছে ব্যাপক। শিক্ষকরাত সমাজেরই অংশ; কিন্তু তাঁরা যে বেতন পান, তা দিয়ে সামাজিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে সরকার নিয়োজিত পে-কমিশন শিক্ষকদের জন্যে যে বেতন নির্ধারণ করেছে, তাতে শিক্ষকদের পদমর্যাদা দুই/তিন ধাপ নিচে নেমে গেছে। বেতনও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বাড়েনি। এতে শিক্ষক সমাজ ক্ষুদ্ধ; তারা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এজন্য প্রস্তাবিত পে-স্কেলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং পদমর্যাদা পুনঃনির্ধারণ করা উচিত।
বর্তমানে পড়ালেখার মান সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন সৃজনশীল পদ্ধতিতে মেধার বিকাশ ঘটেছে, পড়ার টেবিলে ছাত্র-ছাত্রীরা ফিরে এসেছে। নকলের প্রবণতা অনেক কমেছে, ঝরেপড়া আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (ইউজিসি) উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে তীক্ষè নজর রাখছে। সবমিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে কোয়ালিটি শিক্ষার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।
ঐতিহ্যে ভাস্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এআইএস ডিপার্টমেন্টের স্বনামধন্য শিক্ষক হিসেবে আপনার অনুভূতি কী এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, এ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে আমি শিক্ষার্থীদের যতটুকু দিতে পেরেছি এবং এই ডিপার্টমেন্টের উন্নয়নে যতটুকু ভূমিকা রাখতে পেরেছি তাতে আমি সন্তুষ্ট। এআইএস ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা অত্যন্ত মেধাবী। ছাত্র-ভর্তির ক্ষেত্রেও আমরা মেধার মূল্যায়ন করি সর্বাগ্রে। ফলে প্রতিবছর বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে ভর্তির জন্য প্রায় ৪০-৫০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা দিলেও তাদের মধ্য থেকে মেধার ভিত্তিতে মাত্র ১৪০০-১৫০০ জনকে ভর্তি করানো হয়। এখান থেকে এআইএস ডিপার্টমেন্টে ১০০-১২৫ জনকে ভর্তি করে। আমাদের ছাত্ররা পাস করে কর্মজীবনে খুব ভালো করছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের বহু শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে বর্তমানে বিদেশে পড়ালেখা করছে। এটি সম্ভব হচ্ছে এ কারণে যে, ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকগণ আন্তরিকতার সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার অগ্রগতি দেখেন; তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে যতœশীল সহযোগিতা করেন। আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস ও সিমেস্টার সিস্টেমে পড়ানো হয় বলে এ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী শিক্ষা লাভ করছে।
ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলবেন কি এমন জিজ্ঞাসায় ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির অনুমোদনে এ ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়; যা সিন্ডিকেটের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার কার্যক্রম শুরু করে। শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য অঙ্গনে গবেষণার অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষায়িত ব্যবসা-গবেষণার লক্ষ্যে ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চ (বিবিআর) সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়।
এ সেন্টারকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্যে একটি রিসার্চ লাইব্রেরি গড়ে তোলা; যেখানে পাঠকরা রিসার্চ গ্রন্থ, জার্নাল, থিসিস এবং ই-লাইব্রেরির সাহায্যে পৃথিবীর নামকরা লাইব্রেরিগুলোর রিসার্চ বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে পারবে।
বাংলাদেশের শিক্ষার সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রফেসর সিদ্দিক বলেন আমাদের সময় দেখিনি কোনো ড্রাইভার, পিয়ন, দারোয়ানের ছেলে আমাদের সহপাঠী ছিল। বর্তমানে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এআইএস ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের বৃত্তিপ্রদান কমিটিতে থাকার সুবাদে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি যে রিকশাওয়ালার ছেলে, ড্রাইভারের ছেলে, পিয়নের ছেলে, বর্গাচাষীর ছেলে আমাদের ডিপার্টমেন্টসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল এসব শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে আমরা প্রায় একশ’ জন ছাত্রকে দু’হাজার টাকা করে বৃত্তি/অনুদান দিচ্ছি ডিপার্টমেন্টের বৃত্তিফান্ড থেকে। এ পর্যন্ত বৃত্তিফান্ডে বিভিন্ন মাধ্যমে দু’কোটি টাকার ওপর জমা হয়েছে; যার লভ্যাংশ থেকে আমরা প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে থাকি। তাছাড়া একাউন্টিং এলামনাই ও আমাদের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের মধ্য থেকে আমরা কয়েকজন ছাত্রের বৃত্তিদানে স্পন্সর করি। এর দ্বারা সহজেই বোঝা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সোস্যাল রেভুলিউশন বা সামাজিক বিপ্লব ঘটে গেছে। শিক্ষার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে; তাই সবার জন্য শিক্ষা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। রিকশাওয়ালার ছেলে, চা-বিক্রেতার ছেলে, ফেরিওয়ালার ছেলে -এরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে যে অদম্য অগ্রগতি সাধন করেছে; তার জন্য আমাদের গর্ববোধ এবং তাদের পিতা-মাতাদের অভিনন্দিত করা উচিত। আমরা শিক্ষকরা এখন গর্ব করে বলতে পারি আমরা শুধু বিত্তবানদের নয়, বিত্তহীনদের ছেলেমেয়েদেরও পড়াই।
ছাত্র-সংগঠনগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন ছাত্র-ইউনিয়নের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ডিভোশন আছে, তারা নীতিতে চলে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য সংগঠন যেমন ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সীট দখল, হল দখল, ভর্তি-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এগুলোতে লিপ্ত থাকে। এরা নতুন ছাত্রদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করে পেশিশক্তি বাড়ানোর জন্যে। আদর্শহীন, নীতি-নৈতিকতা বর্জিত, শিক্ষাজীবন শেষে এরা কীভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বুঝে নেবে তা আমার বোধগম্য নয়।
তিনি আরও বলেন আমি যখন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম, তখন বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শকে সামনে রেখেছি। আন্দোলন করেছি, সমান তালে পড়াশোনাও চালিয়ে গেছি। আমাদের সময় তখনকার সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন আইয়ূব খানের ন্যাশনাল স্টুন্ডেট ফেডারেশন (এনএসএফ) ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আতংক; কিন্তু গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ, ছাত্র-ইউনিয়ন কোনো সময় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ইত্যাদি অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল না। কিন্তু সেই ঐতিহ্য যে ধরে রাখা যায়নি, আজকের বেদনাদায়ক অনেক ঘটনাই তার প্রমাণ।
এআইএস থেকে পাসকরা ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরি বাজারে কেমন করছে এমন প্রশ্নের জবাবে দৃঢ় আস্থ’াবান, নিবেদিত শিক্ষক প্রফেসর শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে ডিগ্রি নিয়ে যারা বেরুচ্ছে চাকরি বাজারে তারা খুব ভালো করছে। এদের শতকরা ১০-১৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায়, ২০-৩০ জন সিএ ফার্মে আর বাকিরা ব্যাংক-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে বা নিজেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। ফলে এটুকু বলতে পারি, এআইএস ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা বেকার নেই।
একাউন্টিং এলামনাই এর বর্তমান কার্যক্রমে আপনি কি সন্তুষ্ট এমন প্রশ্নের জবাবে নিবেদিত শিক্ষাবিদ প্রফেসর শফিক বলেন, এটির ফাউন্ডার অধ্যাপক ড. হারুনুর রশিদ; আমি দু’বছরের জন্য এর প্রেসিডেন্ট হয়েছিলাম। আমরা সংগঠনে কড়াকড়িভাবে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে থাকি। ফলে একবার কেউ প্রেসিডেন্ট হলে পরবর্তী টার্মে ঐ পদে তার আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকে না। বাই-রোটেশন সবার বেলায় এক সময় না এক সময় নেতৃত্বে আসীন হবার সুযোগ থাকে। এলামনাই এর কোনো সদস্য আর্থিক অসুবিধা কিংবা বিপদগ্রস্ত হলে আমরা কল্যাণ ফান্ড থেকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে থাকি।
বর্তমান এলামনাই কমিটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ড. শফিক সিদ্দিক বলেন, এলামনাই কমিটিকে যে বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হবে তা হলো এআইএস ডিপার্টমেন্ট থেকে যেসব ছাত্র-ছাত্রী পাস করে বেরোয় তাদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করে তাদেরকে এলামনাই এর সাধারণ সদস্য করে নেয়ার চেষ্টা করা। এভাবে ৮০% ছাত্র-ছাত্রীকে মেম্বার করে নেয়া সম্ভব হবে। এজন্য বর্তমান এলামনাই কমিটিকে মেম্বারশিপ ড্রাইভ জোরদারের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশে একাউন্টিং এসোসিয়েশন গঠন সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে দূরদর্শী শিক্ষক-ব্যক্তিত্ব প্রফেসর শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন আইসিএবি, আইসিএমএবি, বিশ্ববিদ্যালয় একাউন্টিং এলামনাই এসোসিয়েশনসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন রয়েছে; যাদের চিন্তা ও মত ভিন্ন ভিন্ন। অতীতে কোনো কোনো জুনিয়র শিক্ষক এ ধরনের এসোসিয়েশন গড়ার উদ্যোগ নিলেও তাঁরা সফল হননি। এখন ড. হারুনুর রশিদসহ সিনিয়র শিক্ষকরা যদি এ ধরনের এসোসিয়েশন গঠনের উদ্যোগ নেন, তাহলে সফলতা আসতে পারে বলে আমি আশাবাদী।
দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের সাফল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাদ্যোক্তা, প্রবীণ শিক্ষাবিদ প্রফেসর শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্য অসাধারণ, শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকেও তাদের সুনজর রয়েছে। স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীরা সমতায় এসে গেছে, ফলাফলে ছাত্রীরা ভালো করছে। কিছু কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা বিরাজ করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-শৃংখলা, শিক্ষার পরিবেশ, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ইত্যাদি এক কথায় চমৎকার পর্যায়ে রয়েছে। আমার দৃষ্টিতে নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতার অন্যতম কারণ হচ্ছে যোগ্য শিক্ষককে উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ না দেয়া। অনেক সময় নিয়োগপ্রাপ্ত এই উপাচার্যগণ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, অপচয় ইত্যাদির মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে শিক্ষকদের মধ্য থেকে একটি গ্রুপ বেরিয়ে এসে উপাচার্যের অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায়। উপাচার্য অফিসের সামনে মানববন্ধন করে, উপাচার্যের কক্ষে তালা লাগায় এবং কর্মবিরতি ঘোষণা করে। এভাবে কর্মসূচি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অচল করে দেয়; শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, সেশনজট বাড়ে। কাজেই দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিয়োগ না দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগ দিলেই সমস্যার অনেকটা সমাধান হতে পারে বলে আমি মনে করি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে বিইউবিটি’র বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী এমন প্রশ্নে বিইউবিটি’র প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, ব্যবসায়িক লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমরা সমমনা কয়েকজন মিলে এর কার্যক্রম শুরু করি।
আমাদের মধ্যে শিল্পপতি বা বড় ব্যবসায়ী কেউ ছিলেন না। এটি কোনো লাভজনক ব্যবসা-উদ্যোগও নয়; মানোন্নত শিক্ষা প্রদান এবং শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ সাধনই আমাদের লক্ষ্য ছিল, যা আজও এ প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান আছে। আমাদের ১১ সদস্যের মধ্যে ৮ জনই শিক্ষাবিদ; একজন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, একজন একাউন্টেন্ট ও একজন ডাক্তারকে নিয়ে বর্তমান পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিইউবিটিতে একাডেমিক বিষয়ে আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না; তাই বিইউবিটি’র ছাত্র-ছাত্রীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হচ্ছে। আমাদের এখানে খুব মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী আসে না। আমরা যাদের ভর্তি করি, তাদেরকে ঘষেমেজে ঠিক করি; ফলশ্রুতিতে কর্মবাজারে তারা কেউ বেকার নেই।
বিইউবিটি-কে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, বর্তমানে ২০০ জন শিক্ষক নিবেদিত হয়ে পাঠদান করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি খোলার চিন্তা-ভাবনা আছে। তবে মেডিকেল ফ্যাকাল্টি খোলা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব হবে না, এজন্যই বিদেশি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জয়েন্ট কোলাবোরেশন করার প্রক্রিয়া চলছে।
ঢাকা কমার্স কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষাদ্যোক্তা প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, ১৯৯০ সালে এক দুঃসময়ে এ কলেজের কর্ণধার প্রফেসর নূরুল ইসলাম ফারুকী আমাকে এর সাথে সম্পৃক্ত করেন। দেশের দু’চারটে কলেজ ছাড়া অন্য কলেজ সম্পর্কে আমার বেশি জানা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ট্রেজারার প্রফেসর ড. শহিদ উদ্দীন আহমেদ এর অনুরোধে এবং প্রফেসর ফারুকী সাহেবের একাগ্রতায় আমি ঢাকা কমার্স কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সাথে যুক্ত হতে রাজি হই। মিরপুরে কলেজের অবস্থান; মিরপুর জায়গাটা অনেক খারাপ বলে আমার ধারণা ছিল। আমি প্রথমে কলেজে গেলাম, ফারুকী সাহেবের চেম্বারে। চারদিক নিঃশব্দ, আমি ফারুকী সাহেবকে বললাম কলেজ কী বন্ধ? তিনি বললেন না, কলেজ খোলা। নিয়ম-শৃংখলা কড়াকড়িভাবে মানা হয় বলে সকাল ৮টার মধ্যে কলেজ কম্পাউন্ডে ছাত্র-ছাত্রীদের ঢুকতে হয়। আর দেরি হলে খাতায় এন্ট্রি করে ঢোকার অনুমতি নিতে হয়, ফলে কেউই দেরি করে আসে না। আমি আরো লক্ষ্য করলাম যে কলেজের মাঠে বা বারান্দায় ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো পায়চারি নেই, এমনই সুশৃংখল। আশেপাশের দেয়ালে কোনো পোস্টার, লিফলেট নেই। আমার ভালো লাগলো। ১৯৯৮ সালে সেই যে অন্তর্ভুক্ত হলাম ২০১৫ সাল পর্যন্ত তা চলছে। এর মধ্যে অধিকাংশ সময় চেয়ারম্যান ছিলাম, দু’একবার মেম্বার ছিলাম। অনেক দিনত হয়ে গেলো। আমি মনে করি যথেষ্ট হয়েছে। নিজের মেধা, শ্রম, সময় দিয়েছি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে; এবার ছাড়তে হবে। কখন যোগ দিয়েছেন সেটি বড় নয়, কখন ছাড়তে হবে সেটিই বড় কথা। আমাকে ছাড়া চলবে না, এ কথায় আমি বিশ্বাস করি না। নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। এ নীতিতে ঢাকা কমার্স কলেজ সুন্দর, সুষ্ঠু এবং সফলভাবে চলতে পারবে।
ঢাকা কমার্স কলেজের চেয়ারম্যান হিসেবে এ কলেজের উন্নয়নে কী কী কাজ করার সুযোগ হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে কর্মদ্যোগী শিক্ষাবিদ প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, ঢাকা কমার্স কলেজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আগেকার নিয়মের স্থলে আমি ১৯৯৮ সালে নতুন নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করি, যা গভর্নিং বডিতে গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট দেয়া হয়। এখানে ইন্টারভিউয়ের পরপরই প্রার্থী নিজে ফলাফল জেনে যেতে পারে। এ পদ্ধতি নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো কথা হয়নি, কেউ প্রশ্ন তোলেনি। আমি বিশ্বাসকরি শিক্ষক নিয়োগ যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে সবখানে এর প্রভাব পড়বে; রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ হলে রাজনীতির সমস্যাগুলো কলেজে চলে আসবে। দ্বিতীয়তঃ এখানে আমি একাডেমিক কাউন্সিল করে দিয়েছি, যাতে এ কলেজের শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে। এছাড়া ফাইন্যান্স কমিটি, ডেভেলপমেন্ট কমিটি করেছি।
একাডেমিক কমিটির সুপারিশের আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কমার্স কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যদের মধ্যে এত বছরেও কোনো দ্বিমত দেখা যায়নি। ফারুকী সাহেব বর্তমানে অধ্যক্ষ না থাকলেও তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা কমার্স কলেজ সুন্দরভাবে চলছে। প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, বেসরকারি কলেজের মধ্যে ঢাকা কমার্স কলেজই ব্যতিক্রম। এখানে ৭০ জন শিক্ষকের আবাসিক কোয়ার্টার আছে। শিক্ষকরা আন্তরিক, তবে কোচিং সেন্টার ইদানিং কোনো কোনো শিক্ষককে আকর্ষণ করছে বলে জানতে পেরেছি। আমি মনে করি, কোচিং-ভাইরাস কমার্স কলেজে ঢোকা ঠিক হয়নি; এটি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এতে প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা হলেও প্রকারান্তরে কলেজের মঙ্গল হবে। আমরাতো শিক্ষকদের ভালো বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি; তারপরও কিছু কিছু শিক্ষক কেন সন্তুষ্ট থাকতে পারছেন না, তা আমার বোধগম্য নয়।
একটি সুন্দর প্রতিষ্ঠান গড়তে প্রতিষ্ঠান প্রধানের ভূমিকা সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে কৃতী শিক্ষাব্রতী প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করে পরিকল্পিতভাবে এগুতে হবে। কমার্স কলেজকে ঘিরে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন ফারুকী সাহেবের পরিকল্পনা ছিল কমার্স কলেজে স্কুল থাকবে, স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা কলেজে যাবে, সেখান থেকে যাবে ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু ফারুকী সাহেব অবসরে যাওয়ায় স্কুল করার পরিকল্পনাটি বেশিদূর এগোয়নি। তবে কমার্স কলেজে আমরা ভবিষ্যতে বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স এবং বিবিএ-এমবিএ বিষয় চালু করার চিন্তা করছি। এক্ষেত্রে সরকারের অনুমতির জন্য আবেদনও করা হয়েছে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর বিশেষ পরামর্শের কথা জানতে চাইলে প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ প্রফেসর শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোর দিকে সরকারের নজর দিতে হবে। এখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ-নীতি কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করা উচিত। ঢাকার বাইরের কলেজ-ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপি তথা রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত করতে হবে; কেননা তাদের লোক নিয়োগ দিতে গিয়ে যোগ্য লোক বাছাই করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে দলীয় ছাত্র-রাজনীতি সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতন্ত্র চর্চা বন্ধ হয়ে গেছে। ডাকসু, বাকসু, ইয়েকসু ছাত্র-সংসদের নির্বাচনগুলো অবিলম্বে চালু করতে হবে। এসব ছাত্র-সংসদে অতীতে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরাই অংশ গ্রহণ করতেন, নির্বাচিত হতেন। কিন্তু ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হবার কারণে ছাত্র-রাজনীতিতে পেশি শক্তির উদ্ভব হয়েছে, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। গণতন্ত্রের চর্চা না থাকাতে ভবিষ্যৎ জাতীয় সঠিক নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা যদি না থাকত তাহলে আমরা মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেননকে পেতাম না। এখন যা হয়েছে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। এজন্য অবিলম্বে ডাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। ফেয়ার ইলেকশন হলে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। আপনি বঙ্গবন্ধুর জামাতা, জাতির জনককে আপনি কেমন দেখেছেন এ প্রশ্নে মেধাবী শিক্ষাবিদ ড. শফিক সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ হয়নি। আমার খালুর সাথে স্বাধীনতার পূর্বে কয়েকবার তাঁর বাসায় গিয়েছি। ছাত্র রাজনীতিতে খুব সিরিয়াস না থাকলেও অন্যান্য ভালো ছাত্ররা ছাত্রলীগের রাজনীতি যেমনভাবে করত, আমিও তেমনি ছিলাম। পরবর্তীতে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলাম। আমার খালু আমার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যা শুনে বঙ্গবন্ধু আমাকে আদরের সাথে কাছে টেনে নেন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদেরকে আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতেন। আপনার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মেম্বার হয়েছেন, এতে আপনার অনুভূতি কী এমন প্রশ্নে গর্বিত পিতা প্রফেসর শফিক সিদ্দিক বলেন, সে যে রাজনীতিতে এতদূর এগুবে তার ছোট বেলায় তা বোঝা যায়নি। টিউলিপ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করেছে। সে খুব হাসিখুশি, পরোপকারী মেয়ে; সমাজকর্মের দিকে তার ঝোঁক আমি বরাবরই লক্ষ্য করেছি। সে যে ভবিষ্যতে বিবেকবান হিসেবে গড়ে উঠবে, এর লক্ষণ স্পষ্ট ছিল। প্রচুর বই পড়ত; আমি বাইরে কোথাও গেলে তার জন্য কী আনব জিজ্ঞেস করলে বলত বাবা, আমার জন্য ভালো বই নিয়ে এসো। ঢাকায় ‘ও’ লেভেল করে ইংল্যান্ড গেলো; তারপর কীভাবে সে পলিটিক্সে এতদূর এগুলো আমরা আঁচ করতে পারিনি। ব্রিটিশ লেবার পার্টির ছাত্র-সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে যায় সে। ২০০৮ সালে আমি যখন ইংল্যান্ড যাই, টিউলিপ তখন আমাকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কার্যক্রম দেখানোর জন্য নিয়ে যায়। সে তখন একজন ব্রিটিশ এমপি’র সহকারী হিসেবে কাজ করছিল, এভাবে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছিল। সে লেবার পার্টির লোকাল কমিটি থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। সে প্রথমে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়। এ ধাপটা অতিক্রম না করলে এমপি নির্বাচনে পার্টির মনোনয়ন পাওয়া যায় না। ঐ দেশে লোকাল কমিশনারদের অনেক ক্ষমতা। নানারকম অভাব-অভিযোগ, অসুবিধা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীরা প্রতিকারের জন্য লোকাল কমিশনারের শরণাপন্ন হয়। এসব কাজের মাধ্যমে কমিশনার কিংবা কাউন্সিলররা এমপি’র ট্রেনিং পেয়ে যায়। টিউলিপও ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছে বলে আজ এ সফলতা পেয়েছে।
পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে এক জিজ্ঞাসার জবাবে ড. শফিক সিদ্দিক বলেন, আমাদের পরিবার ছিল প্রফেশনাল; আমি সেই ঐতিহ্যই ধারণ করে চলেছি। বাবা সরকারি চাকরি করতেন, অবৈধ পথে জীবিকা অর্জন করেননি। টাকা-পয়সা প্রচুর না থাকলেও অভাব ছিল না। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে প্রায় সবাই প্রফেশনে ভালো অবস্থানে ছিলেন। এখন যেটা গুলশান পার্ক, সেখানে প্রথম বাড়িটাই ছিল আমার দাদার। ওটা ছিল তখন গ্রাম। ১৯৫৮ সালে গুলশান শহর হবার পর আব্বা প্লট পেলেন। এরপর থেকে নানা বাড়ির সাথে আমাদের সম্পর্ক আরও নিবিড় হলো। নানা সে সময়কার নামকরা শিক্ষাবিদ জালাল উদ্দিন আহমদ। তিনি ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। নানা এর আগে চট্টগ্রামে সরকারি কলেজে ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান আমার খালু। নানার বাড়িতে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাই নানার দিকের আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আমার একটা আলাদা আকর্ষণ আছে।
জীবন-দর্শন সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. সিদ্দিক বলেন শিক্ষক হিসেবে পেশা শুরু করেছিলাম, শিক্ষক হিসেবেই কর্মজীবন শেষ করতে চাই। শিক্ষার বিস্তৃত অঙ্গনে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জিজ্ঞাসার জবাবে দৃঢ় আশাবাদী শিক্ষক-ব্যক্তিত্ব প্রফেসর শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে কিছু লোক মারা গেলে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তখন লোক সংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি, আর আজ ১৮ কোটি লোকের খাদ্যসংস্থান করে বাংলাদেশ এখন বিদেশেও চাল রপ্তানি করছে। হাইব্রীড ধান আবিষ্কারের ফলে ফলন ৩/৪ গুণ বেড়ে গেছে। কৃষিজীবী-শ্রমজীবী সবার আয় বেড়েছে, অশিক্ষিত লোকরাও বেকার নেই; ফলে গ্রামে কাজের লোক পাওয়া কষ্টকর হচ্ছে। তবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সরকারকে ভাবতে হবে। দেশের উন্নয়নে প্রবাসী এবং গার্মেন্টস কর্মীদের অবদান অনেক বেশি। প্রবাসীদের রেমিটেন্স আর তৈরি পোশাক শিল্পের আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রবল বিশ্বমন্দার মধ্যেও সচল রেখেছে। তাই এ দু’টি খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মূল্যবান পরামর্শ রেখে উদারপ্রাণ শিক্ষাবিদ ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করে দেশের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে নিজকে গড়ে তুলতে হবে। দেশপ্রেম, দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে হবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ